
রাষ্ট্রায়ত্ত যমুনা অয়েল, পদ্মা অয়েল ও মেঘনা পেট্রোলিয়াম—দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এই তিন প্রতিষ্ঠান এখন ভয়াবহ আর্থিক ঝুঁকির মুখে। সমস্যাগ্রস্ত পাঁচ ব্যাংকে রাখা মোট ২ হাজার ৩৪০ কোটি টাকার এফডিআর আটকে গেছে দীর্ঘদিন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের অডিট প্রতিবেদন একে সরাসরি “উচ্চ ঝুঁকির সম্পদ” হিসেবে চিহ্নিত করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
মেয়াদোত্তীর্ণ আমানত ফেরত পেতে ব্যর্থ হওয়ার পর নিরীক্ষকরা স্পষ্টভাবে বলেছেন—ব্যাংকগুলোর তীব্র তারল্য সংকটের কারণে এই টাকাগুলো ফেরত পাওয়ার দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। ফলে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ক্রেডিট লস বরাদ্দ না রাখলে প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ “অতিমূল্যায়িত” দেখানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বড় আঘাত: যমুনা অয়েলের ১,৪৬০ কোটি টাকা ডুবন্ত ঝুঁকিতে-
সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে যমুনা অয়েল। প্রতিষ্ঠানটির ১ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা আটকে আছে—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে ৭২০ কোটি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে ৪৩২ কোটি, ইউনিয়ন ব্যাংকে ২৮৯ কোটি এবং আরও কয়েকটি ব্যাংকে বাকি অংশ। মেঘনা পেট্রোলিয়ামের আটকে থাকা অর্থ ৫৪০ কোটি, আর পদ্মা অয়েলের ৩৩৯ কোটি টাকা। এই বিপুল অর্থ আটকে যাওয়ায় তেল কোম্পানিগুলো তাদের মূল ব্যবসার বাইরে যে ১০–১২.৫% সুদে স্থায়ী আমানত থেকে নিয়মিত আয় করত তা কার্যত অচল হয়ে গেছে।
একীভূত ব্যাংকগুলোর ‘নতুন নাম’—কিন্তু পুরোনো সংকট সেই জায়গায়-
ফার্স্ট সিকিউরিটি, এক্সিম, গ্লোবাল, সোশ্যাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংক একীভূত হয়ে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নাম নিয়েছে। কিন্তু নাম পাল্টালেও তারল্য সংকট পাল্টায়নি—অডিটরদের মন্তব্য তাই বলছে। ৩৫ হাজার কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধনে যাত্রা শুরু করলেও তেল কোম্পানিগুলোর আটকে থাকা এফডিআর ফেরত দেওয়ার কোনো নিশ্চিত সময়সীমা নেই।
রাজনৈতিক প্রভাব ও পূর্ববর্তী ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্তে ধস-
তেল কোম্পানিগুলোর একাধিক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন—পূর্ববর্তী ব্যবস্থাপনার রাজনৈতিক চাপ, লবিং ও অনৈতিক প্রভাবের কারণেই বিপুল টাকার এফডিআর এসব ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকে রাখা হয়েছিল। এখন সেই ভুল সিদ্ধান্তের দায় বহন করছে বর্তমান কর্তৃপক্ষ ও শেয়ারহোল্ডাররা।
বিশ্লেষকদের হুঁশিয়ারি: মূল ব্যবসা বাদ দিয়ে সুদের আয়ে ভরসা—এটাই আসল সমস্যা
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানিগুলো মূল ব্যবসায় দক্ষতা বাড়ানোর বদলে সুদের আয়ে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এই দুর্বল ব্যবসায়িক মডেল এখন বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করেছে। তাদের মতে, এফডিআর উদ্ধার না হলে ভবিষ্যৎ লাভ, নগদ প্রবাহ, ডিভিডেন্ড এবং বার্ষিক আর্থিক স্থিতিশীলতা—সবকিছুই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অর্থ সুরক্ষায় আশ্বাস—তবে উদ্ধার অনিশ্চিত-
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ডিপোজিট প্রটেকশন অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী সাধারণ গ্রাহকদের ২ লাখ টাকা পর্যন্ত সুরক্ষিত। কিন্তু রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানিগুলোর হাজার হাজার কোটি টাকা উদ্ধার হবে কি না—তা এখনো ধোঁয়াশা। সবশেষে স্পষ্ট হয়ে উঠছে—এই তিন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক নিরাপত্তা এখন সরকারের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে।
রাষ্ট্রীয় তেল খাতে ঝুঁকির লালবাতি জ্বলছে—এবং সেটা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে উজ্জ্বল।


